
ব্যাটারিচালিত রিকশা: সুবিধার খেসারত
-এস এম সৈকত
গত ৬ মে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে নিজের বাড়ির সামনে খেলছিল পাঁচ বছরের শিশু জান্নাতি। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যান। ১৮ জুলাই দক্ষিণখানে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ১৭ বছরের কিশোর শিশির প্রাণ হারায়। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং আমাদের শহর ও পরিবহনব্যবস্থায় দ্রুত বিস্তার লাভ করা একটি অনিয়ন্ত্রিত সুবিধার মানবিক মূল্য। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে সংঘটিত ৪ হাজার ৯১০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ২৫৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশাসংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, যাত্রীদের কাছে সহজলভ্য এই যানটি যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে গুরুতর জননিরাপত্তা সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-সংকটকে সাধারণত দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া বিলের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। নিঃসন্দেহে এগুলোই সংকটের প্রধান কারণ। তবে সংকটটি আমাদের সামনে আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হাজির করেছে: নাগরিক হিসেবে আমরা কতটা দায়িত্বশীলভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি- এবং আমাদের দৈনন্দিন পছন্দগুলো কীভাবে ইতোমধ্যে নাজুক বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে? ব্যাটারিচালিত রিকশা এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এগুলো দ্রুতগামী, সাশ্রয়ী এবং প্রায় আমাদের দোরগোড়াতেই পাওয়া যায়। স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় হেঁটে, সাইকেলে কিংবা প্যাডেলচালিত রিকশায় যাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা অনেকেই ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নিই। যানজটে জর্জরিত শহরগুলোয় নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ও নিরাপদ পদচারী অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। ফলে সুবিধা এখানে বিলাসিতা নয়; অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রয়োজন বলে মনে হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য নতুন চাহিদা সৃষ্টি করেছে। অধিকাংশ যান ও চার্জিং গ্যারেজ আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে প্রাপ্ত হিসাবেও ভিন্নতা রয়েছে। গবেষণা বলছে, একটি সাধারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা একবার চার্জ করতে প্রায় আট থেকে দশ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। প্রতিদিন লাখ লাখ যান চার্জ হলে সম্মিলিত চাহিদা উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে- বিশেষ করে চার্জ করার সময়টি বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ের সঙ্গে মিলে গেলে। এর অর্থ এই নয় যে ব্যাটারিচালিত রিকশাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-সংকট সৃষ্টি করেছে। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তি, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের আর্থিক সংকটের জন্য এসব রিকশা দায়ী নয়। চালকদের এককভাবে দায়ী করাও অন্যায্য হবে। অধিকাংশ চালক নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং এসব যান লাখ লাখ মানুষের সাশ্রয়ী ‘লাস্ট-মাইল’ যাতায়াত নিশ্চিত করছে।
এই খাতের কর্মসংস্থানের অবদানও উপেক্ষা করা যায় না। চালক ছাড়াও মালিক, গ্যারেজ পরিচালনাকারী, মেকানিক, চার্জিংকর্মী, ব্যাটারি বিক্রেতা ও যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীর জীবিকা এর সঙ্গে যুক্ত। পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান না থাকায় একটি রিকশা ভাড়া নিয়ে চালানো হাজারো তরুণের জন্য দ্রুত আয় করার সহজ পথ। এটি পরিবার চালানোর সুযোগ দেয় এবং প্যাডেল রিকশার দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক শ্রমও কমায়। কিন্তু পেশাটিতে প্রবেশের এই সহজ সুযোগই খাতটির বড় ঝুঁকি। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই বা সড়কনিরাপত্তা শিক্ষা ছাড়াই একজন ব্যক্তির হাতে মোটরচালিত যান তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক চালকের লেন ব্যবস্থাপনা, ব্রেকিং দূরত্ব, গতিসীমা, ট্রাফিক সংকেত কিংবা হঠাৎ বাঁক নেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। কোথাও কোথাও অপ্রাপ্তবয়স্করাও এসব যান চালায়।
যানগুলোর নির্মাণমানেও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয়ভাবে সংযোজিত অনেক রিকশায় ব্রেক, টায়ার, আলো, ভারসাম্য, মোটরের ক্ষমতা ও গতিসীমার অভিন্ন মান নেই। হালকা কাঠামো ও তুলনামূলক শক্তিশালী মোটরের কারণে হঠাৎ বাঁক বা ব্রেক করার সময় এগুলো ভারসাম্য হারাতে পারে। যাত্রী তোলার জন্য আকস্মিকভাবে থেমে যাওয়া, উল্টো পথে চলা এবং দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য নির্ধারিত সড়কে প্রবেশও প্রায় স্বাভাবিক দৃশ্য। মহাসড়কে বাস-ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে সামান্য ভুলও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। শিশু, প্রবীণ, পথচারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ঢাকাকেন্দ্রিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৩০ শতাংশ যাত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন; প্যাডেলচালিত রিকশার ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৮ শতাংশ। ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনার প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ গুরুতর বা অত্যন্ত গুরুতর পরিণতি সৃষ্টি করেছে; প্যাডেলচালিত রিকশার ক্ষেত্রে হারটি ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ। একই গবেষণায় জরিপ করা ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের বাইরে ছিল। ফলে দুর্ঘটনার তদন্ত, মালিক শনাক্ত, জরিমানা কার্যকর বা আহত যাত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নাগরিক আচরণ, বাণিজ্যিক সুবিধা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার বৈপরীত্যটিও দৃশ্যমান করে। নাগরিকেরা সুবিধা ভোগ করেন, মালিকেরা আয় করেন এবং অনানুষ্ঠানিক গ্যারেজগুলো কখনো আবাসিক, অনিরাপদ বা অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করে। তাৎক্ষণিক সুবিধা ব্যক্তিগত হলেও অনেক ব্যয় জনগণকে বহন করতে হয়: ট্রান্সফরমারের ওপর চাপ, পিক আওয়ারে উচ্চ চাহিদা, রাজস্ব ক্ষতি, অনিরাপদ সড়ক এবং লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবেশগত ক্ষতি। অনিরাপদভাবে এসব ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার করা হলে বাতাস, মাটি ও পানিতে সিসা ছড়িয়ে শ্রমিক ও আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে।
দায়িত্বশীল ব্যবহার শুধু অপ্রয়োজনীয় বাতি নিভিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎকে একটি সম্মিলিত এবং বর্তমানে সীমিত জাতীয় সম্পদ হিসেবে স্বীকার করা সময়ের দাবি। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে শুধু নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে বলা যায় না। শহরে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, নিরাপদ হাঁটা ও সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা কিংবা পর্যাপ্ত অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন না থাকলে মানুষের কাছে ব্যাটারিচালিত রিকশা পরিহারের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
সমাধান হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা নয়। তাতে বহু মানুষের জীবিকা ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ নষ্ট হবে এবং খাতটি আরও গোপন ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর। প্রতিটি যান ও চার্জিং গ্যারেজ নিবন্ধিত করতে হবে। চার্জিং স্থাপনায় আলাদা মিটার, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং অফ-পিক চার্জিং নিশ্চিত করতে হবে। স্মার্ট টাইমার দিয়ে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যান চার্জ হওয়া ঠেকানো যেতে পারে।
প্রতিটি শহরকে সড়কের ধারণক্ষমতা, যাত্রীচাহিদা ও চার্জিং অবকাঠামোর ভিত্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। এগুলোকে পাড়া-মহল্লা ও ‘লাস্ট-মাইল’ রুটে সীমাবদ্ধ রেখে মহাসড়ক ও দ্রুতগতির প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘মালিক-চালক’ মডেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে- যাতে অনুমতি প্রকৃত প্রশিক্ষিত চালকের কাছে যায়, এমন কোনো বিত্তবান মালিকের কাছে নয়, যিনি ২০টি রিকশা কিনে অপ্রশিক্ষিত চালকদের কাছে ভাড়া দেন। প্রত্যেক চালকের পরিচয় যাচাই, প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট সময় পর লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। প্রতিটি অনুমোদিত রিকশায় কঠিন নম্বরপ্লেট ও কিউআর কোড যুক্ত থাকতে পারে, যা পৌর ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। যাত্রী ও ট্রাফিক কর্মকর্তা এর মাধ্যমে নিবন্ধন, চালক, ফিটনেস ও অনুমোদিত রুট যাচাই করতে পারবেন। ট্রাফিক সিগন্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ক্যামেরা নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে লালবাতি অমান্য, অতিরিক্ত গতি, উল্টো পথে চলা বা নিষিদ্ধ সড়কে প্রবেশের প্রমাণভিত্তিক জরিমানা করতে পারে। তবে ভুল জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলো সমবায় ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জিং হাব তৈরি করতে পারে। মোটর, চার্জার ও ব্যাটারির ন্যূনতম মান নির্ধারণ এবং ব্যবহৃত ব্যাটারি নিরাপদে পুনর্ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু রিকশা নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; শহরকে নিরাপদ বিকল্প দিতে হবে। আবাসিক এলাকা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও প্রধান পরিবহন করিডর যুক্ত করে নিয়মিত ‘সার্কুলার’ বাস চালু করা যেতে পারে। কমপ্যাক্ট বৈদ্যুতিক বাসগুলো সৌরবিদ্যুৎ-সহায়ক ডিপো, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও অফ-পিক গ্রিড বিদ্যুতের সমন্বয়ে চার্জ হতে পারে। ব্যাটারিচালিত রিকশা তখন সরু রাস্তা ও মহল্লায় ফিডার বা ‘লাস্ট-মাইল’ যান হিসেবে চলবে- পুরো শহরে বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে না। প্রশিক্ষিত রিকশাচালকদের বৈদ্যুতিক বাসচালক, কন্ডাক্টর, চার্জিং টেকনিশিয়ান ও ডিপোকর্মী হিসেবে নিয়োগের সুযোগ দিলে এই রূপান্তর কর্মসংস্থানও রক্ষা করবে। নাগরিকদেরও ভাবতে হবে, প্রতিটি স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় মোটরচালিত যান সত্যিই প্রয়োজন কি না। দায়িত্বশীল চলাচল দায়িত্বশীল বিদ্যুৎ ব্যবহারেরই অংশ।
ব্যাটারিচালিত রিকশা এই গল্পের খলনায়ক নয়; বরং আমাদের সামনে ধরা একটি আয়না। এটি দেখায়, সুবিধা কত দ্রুত নির্ভরশীলতায় পরিণত হয় এবং নিয়ন্ত্রণহীন উদ্ভাবন কীভাবে জনসাধারণের ওপর নতুন ব্যয় চাপায়। আসল চ্যালেঞ্জ এগুলো সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তার মানোন্নয়ন এবং আধুনিক নগর পরিবহনে যৌক্তিক স্থান নির্ধারণ করা।
সুবিধার মূল্য আছে। কিন্তু সেই মূল্য আর প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু, বিষাক্ত দূষণ, সড়কের বিশৃঙ্খলা, শ্রমিকের শোষণ এবং ক্রমেই চাপে পড়া বিদ্যুৎব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করা উচিত নয়।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সিরাক-বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক
Link to the main News Paper op-ed: https://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2026/09/11/1737478

